"পবিত্র বস্তু কুকুরদিগকে দিও না, এবং তোমাদের মুক্তা শূকরদিগের সম্মুখে ফেলিও না; পাছে তাহারা পা দিয়া তাহা দলায়, এবং ফিরিয়া তোমাদিগকে ফাড়িয়া ফেলে" (মথি ৭:৬)। এর অর্থ কী? প্রভু যীশু যখন সোর ও সীদোন প্রদেশে গিয়েছিলেন, তখনও অনুরূপ একটি ঘটনা ঘটেছিল (মথি ১৫:২১-২৮)। প্রভু যীশু যখন সোর-এ পৌঁছালেন, তখন এক নারী তাঁর কাছে এসে নিজের মেয়ের জন্য সাহায্য চাইলেন; মেয়েটি তখন এক অশুভ আত্মায় (বা ভূতে) আচ্ছন্ন ছিল। প্রভু যীশু তখন তাঁকে বললেন, "সন্তানদের খাদ্য লইয়া কুকুরদের কাছে ফেলিয়া দেওয়া ভালো না" (মথি ১৫:২৬)। কেউ কেউ তাঁর এই উক্তিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রভু যীশু কি সেই নারীকে কুকুর বলেছিলেন? মাত্র একজন মানুষের সাহায্য করার জন্য আপনি কি ১৫০ কিলোমিটার পথ হেঁটে যাবেন-বিশেষ করে এমন একজনের জন্য যাকে আপনি ঘৃণা করেন? ১৫০ কিলোমিটার পথ হাঁটতে কত সময় লাগে? অন্তত কয়েক দিন তো লাগবেই। এখানেই আমরা সেই নারীর প্রতি খ্রীষ্টের ভালোবাসার গভীরতা দেখতে পাই। তিনি তাকে কতটা গভীরভাবে প্রেমও করতেন তা জানা থাকায় আমরা বুঝতে পারি যে, প্রভু আসলে তার বিশ্বাস পরীক্ষা করেছিলেন-এটি দেখার জন্য যে, ঈশ্বরের কাছ থেকে কোনো কিছুই পাওয়ার যোগ্য নয়-এমনটা স্বীকার করে সে কোনো নীচু অবস্থান গ্রহণ করতে ইচ্ছুক কি না। যখন সে বলল, "হাঁ, প্রভু, আমি কুকুরই বটে,কিন্তু টেবিল থেকে পড়ে যাওয়া খাবারের টুকরোগুলো কি আমি পেতে পারি?"তখন প্রভু যীশু বললেন, "হে নারী,তোমার বড়ই বিশ্বাস!"প্রভু যীশু জীবনে মাত্র দুবার কাউকে এমন কথা বলেছিলেন এবং দুবারই তা ছিল অ-ইহুদি ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে। একবার এক রোমান সেনাপতির ক্ষেত্রে এবং অন্যবার এই সোর ও সীদোন প্রদেশের নারীর ক্ষেত্রে। দেখুন, তিনি কীভাবে সেই নারীর প্রশংসা করেছিলেন!
আমাদের বুঝতে হবে যে, ধর্মগ্রন্থে প্রভু যীশু যখন কুকুর ও শূকরের কথা বলেন, তখন তিনি মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করেন না। তিনি আসলে এই সত্যটিই তুলে ধরেন যে, ঈশ্বরের কাছ থেকে কোনো কিছুই পাওয়ার যোগ্য আমরা নই। কেউ যদি এমনটা মনে করেন যে, "ঈশ্বর আমার জন্য কিছু করবেন-এমনটা আমার প্রাপ্য," তবে তিনি ঈশ্বরের সামনে মানুষের প্রকৃত অবস্থানটি বুঝতে পারেননি। আপনি বা আমি-আমরা কেবল নরকেরই যোগ্য। আমরা যদি ঈশ্বরের কাছে গিয়ে বলি, "হে প্রভু, আমার প্রাপ্যটাই আমাকে দিন," তবে তাঁর উচিত আমাদের নরক দেওয়া। এর চেয়ে ভালো যা কিছু আমরা পাই, তা সবই ঈশ্বরের অনুগ্রহ। যখন আমরা এই বিষয়টি উপলব্ধি করি, তখন দেখতে পাই যে ঈশ্বরের কাছ থেকে আমরা এমন অনেক কিছুই পাচ্ছি যা আমাদের প্রাপ্য নয়। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই নিজেদের এই অবস্থানটি উপলব্ধি করে না।
সুতরাং, যখন আমরা এমন কোনো কথা শুনি, তখন তার অর্থ এই নয় যে আমাদেরকে করোর প্রতি কুকুর বা শূকরের মতো আচরণ করতে হবে। আমরা সবাই পাপী; প্রতিটি মানুষই পাপী। আমাদের সবার মধ্যেই পাপ রয়েছে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ঈশ্বরের অনুগ্রহে পরিত্রাণ ও পাপমোচন লাভ করেছি, আর কেউ কেউ এখনও পাপের মধ্যেই রয়েছি; কিন্তু আদমের কাছ থেকে সেই স্বভাব উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার কারণে আদতে আমরা সবাই পাপী। তাই একজনের পক্ষে নিজেকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করার বা অন্য কাউকে কুকুর কিংবা শূকরের মতো তুচ্ছজ্ঞান করার কোনো কারণ নেই।
প্রভু যীশু যখন বলেছিলেন, "কোনপবিত্র বস্তু কুকুরদিগকে দিও না,"তখন তিনি এর অর্থ করেছিলেন, " এমন কিছু তাদের দিও না যার মূল্য তারা বোঝে না বা যার কদর করে না।" একটি কুকুর কেবল মরা পশুর হাড়ই চায়; পবিত্র কোনো কিছুর প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। কোনো মানুষ যখন ঈশ্বরের চেয়ে পার্থিব বস্তুর প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে, তখন এক অর্থে সে পশুর চেয়ে কোনো অংশে ভালো নয়। আপনি কিসের জন্য বেঁচে আছেন? কেবল সন্তান লালন-পালন, যৌনমিলন, ঘুম আর ভালো খাবারের জন্যই কি আপনার জীবন? অথচ পশুপাখিরাও তো এসব বিষয়েই আগ্রহী! পশুপাখিরা সবসময় পার্থিব বিষয়ের প্রতিই আগ্রহী থাকে। কুকুর সবসময় মাটির দিকেই তাকিয়ে থাকে, শূকরের ক্ষেত্রেও তাই। কুকুর বা শূকরকে কখনোই আকাশের দিকে তাকাতে দেখা যায় না। পশুপাখিরা সবসময় মাটির বা পৃথিবীর বিষয়গুলোর দিকেই তাকিয়ে থাকে-আর এখানে 'কুকুর' শব্দটি দিয়ে ঠিক সেই অর্থই বোঝানো হয়েছে; অর্থাৎ, "এমন সব মানুষ যাদের মন পার্থিব বিষয়ের ওপর নিবদ্ধ।"
একজন প্রকৃত খ্রীষ্টান ঊর্ধ্বমুখী দৃষ্টি রাখেন; তিনি ওপরের বা স্বর্গীয় বিষয়গুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন। যারা স্বর্গীয় বিষয়ের প্রতি আগ্রহী নয়, তাদের কাছে পবিত্র কিছু তুলে ধরা অর্থহীন। এটি অনেকটা শূকরের সামনে মুক্তা ছড়ানোর মতো। শূকরের আসলে প্রয়োজন হয় আবর্জনা বা পচা খাবারের; ওটাই তারা খেতে ভালোবাসে, তাই তাদের পবিত্র কিছু দেওয়া বৃথা। প্রভু যীশু এখানে 'পর্বতে প্রদত্ত উপদেশের' (Sermon on the Mount) কথা বলছেন-আর এই উপদেশের শিক্ষা অবিশ্বাসী বা যারা নতুন জীবন লাভ করেনি, তাদের জন্য নয়। মথি ৭:৬ পদের মূল কথাটিই হলো এটি: যারা নতুন জীবন লাভ করেনি (born again নয়), তাদের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেবেন না, কারণ তারা এর মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারবে না। প্রতিটি ব্যক্তিকে কোন সত্যটি জানানো বা দেওয়া উচিত, তা আমাদের বুঝে নিতে হবে। এই পদটিতে খ্রীষ্ট ঠিক সেই কথাই বলছেন।
যারা নতুন জন্ম লাভ করেনি, তাদের জন্য প্রয়োজন হলো মন-পরিবর্তন বা অনুতাপের বার্তাটি শোনা। তাদের জানা প্রয়োজন যে তারা পাপী। তাদের জানা প্রয়োজন যে তারা নরকের যোগ্য। তাদের জানা প্রয়োজন যে তারা পথভ্রষ্ট ও ঈশ্বরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং তারা নরকের অনন্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে চলেছে। অ-খ্রীষ্টান এবং এমনকি খ্রীষ্টান পরিবারে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা-যারা নতুন জন্ম লাভ করেনি বা খ্রীষ্টের সাথে জীবন্ত সম্পর্কে আবদ্ধ হয়নি-তাদের সবারই এই বার্তাটি শোনা প্রয়োজন।
প্রত্যেক মানুষ, যদি সে তার জীবনে ঈশ্বরকে সর্বোচ্চ স্থান না দেয়, তবে সে আসলে পশুর মতোই। কোন পশুর ঈশ্বরের প্রতি কোনো আগ্রহ নেই, প্রার্থনার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই কিংবা ঈশ্বরের বাণী শোনার প্রতিও কোনো আগ্রহ নেই। পৃথিবীতে যখন এমন কোনো মানুষ বাস করে যার প্রার্থনা, ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরের বাণী শোনার প্রতি কোনো আগ্রহই নেই, তখন সে পশুর চেয়ে কোনো অংশে ভালো নয়। পশুর আগ্রহ থাকে যৌনতার প্রতি। মানুষ যখন মূলত যৌনতার প্রতিই আগ্রহী হয়ে ওঠে, তখন সে পশুর মতো আচরণ করে। প্রতিটি পশুরই যৌনতা ও খাদ্যের প্রতি আগ্রহ থাকে; আর মানুষ যখন কেবল খাদ্য, যৌনতা, ঘুম এবং সন্তান উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তারাও পশুর মতোই হয়ে যায়। কিন্তু ঈশ্বর যখন আদমকে সৃষ্টি করেছিলেন, তখন সেখানে একটি পার্থক্য ছিল। তিনি আদমকে সেই একই মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন যা দিয়ে তিনি শূকর, কুকুর এবং অন্যান্য সব প্রাণীকে সৃষ্টি করেছিলেন-উপাদানটি ছিল হুবহু একই।
কুকুর ও শূকরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, মানুষের অভ্যন্তরীণ অঙ্গের সাথে এগুলোর অনেক মিল রয়েছে। তাই ঈশ্বর যা বোঝাচ্ছিলেন তা হলো-শারীরিক গঠনের দিক থেকে তোমরা উভয়েই একই উপাদান দিয়ে তৈরি। আর ঠিক এ কারণেই ঈশ্বর ষষ্ঠ দিনে প্রাণী ও মানুষ-উভয়কেই সৃষ্টি করেছিলেন। ষষ্ঠ দিনের প্রথমার্ধে তিনি প্রাণীগুলোকে সৃষ্টি করেন এবং দ্বিতীয়ার্ধে মানুষকে সৃষ্টি করেন। তবে প্রাণীদের ক্ষেত্রে একটি বড় পার্থক্য ছিল: ঈশ্বর তাদের মধ্যে প্রাণবায়ু ফুঁকে দেননি। ধূলিকণা থেকে সৃষ্টির সময়ই তারা প্রাকৃতিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস লাভ করেছিল; কিন্তু মানুষ সৃষ্টির পরপরই ঈশ্বর তার মধ্যে প্রাণবায়ু ফুঁকে দিলেন এবং সে এক জীবন্ত প্রাণীতে পরিণত হলো (আদিপুস্তক ২:৭)। আর এই বিষয়টিই-অর্থাৎ ঈশ্বরের সেই প্রাণবায়ু-মানুষকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণীদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
ঈশ্বর যদি আদমের মধ্যে প্রাণবায়ু ফুঁকে না দিতেন, তবে তাকে দেখতে হয়তো মানুষের মতোই লাগত, কিন্তু তিনি হয়তো পশুর মতো হতেন। কিন্তু ঈশ্বর যখনই তার মধ্যে প্রাণবায়ু ফুঁকে দিলেন, তখনই তিনি এক জীবন্ত সত্তায় পরিণত হলেন। তিনি এক অনন্ত সত্তা হয়ে উঠলেন-পশুদের মতো নন, কারণ পশুরা অনন্ত নয়। কোনো পশু মারা গেলে তারা কেবল ধুলোয় মিশে যায়। কিন্তু ঈশ্বর যখন মানুষের মধ্যে প্রাণবায়ু সঞ্চার করলেন এবং মানুষ জীবন্ত সত্তা হয়ে উঠল, ঠিক সেই মুহূর্তেই সে এক অনন্ত সত্তায় পরিণত হলো-এমন এক অনন্ত সত্তা যাকে ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তার মধ্যে তখনো 'অনন্ত জীবন' ছিল না; কারণ অনন্ত জীবন বলতে এমন জীবনকে বোঝায় যার কোনো শুরু নেই, আর কেবল ঈশ্বরেরই তা রয়েছে। তবে আমরা সেই অনন্ত জীবন লাভ করতে পারি যখন আমরা আমাদের পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে খ্রীষ্টের কাছে আসি এবং তাঁকে আমাদের প্রভু ও ত্রাণকর্তা হিসেবে গ্রহণ করি। তখন আমরা অনন্ত জীবন লাভ করব। তা না হলে, আমরা কেবল এমন অনন্ত সত্তা হিসেবেই থেকে যাব যারা নরকে যাবে এবং ঈশ্বরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেখানে অনন্তকাল বাস করবে।
প্রভু যা বলছেন তা হলো, পৃথিবীতে মানুষের দুটি ভিন্ন শ্রেণি রয়েছে। একদল মানুষ পশুর (যেমন কুকুর ও শূকর) মতো জীবনযাপন করে; আর অন্যদল মানুষ উপলব্ধি করে যে তারা ঈশ্বরের সন্তান এবং ঈশ্বর তাদের এমন এক অনন্ত সত্তা হিসেবে সৃষ্টি করেছেন, যাদেরকে তাঁর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ঈশ্বর যখন মানুষের মধ্যে প্রাণবায়ু সঞ্চার করলেন, তখন সে ধূলিকণা থেকে গঠিত হলেও তার মধ্যে এমন এক বিবেক দেওয়া হলো যা তাকে সচেতন করে তোলে যে, নিজের কাজ ও কথার জন্য তাকে ঈশ্বরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। পশুর কোনো বিবেক নেই। কোনো ভুল কাজ করলে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে না; অথচ মানুষের (এমনকি সে যদি কোনো অরণ্যের সম্পূর্ণ নিরক্ষর ও অসভ্য মানুষও হয়) মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করে, কারণ তার বিবেক রয়েছে।
এমনকি গভীর অরণ্যের অসভ্য বা আদিম মানুষেরাও কোনো কিছুর সামনে মাথা নত করে উপাসনা করে-তা হতে পারে কোনো পাথর, শিলাখণ্ড কিংবা সূর্য। তাদের মধ্যে এমন এক বোধ কাজ করে যে, একজন সৃষ্টিকর্তা বা এক শাশ্বত সত্তা রয়েছেন, যার কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু কুকুর, বানর বা শূকরের মধ্যে কখনোই কোনো ধর্মীয় চেতনা বা উপাসনার প্রবণতা দেখা যায় না। তাহলে কেন সেই আদিম মানুষদের মধ্যেও এক শাশ্বত সত্তার প্রতি সেই সচেতনতা বা বোধ থাকে, যার কাছে তারা দায়বদ্ধ? এর কারণ হলো তাদের বিবেক রয়েছে। প্রতিটি মানুষেরই বিবেক আছে, আর এই বিবেকই মানুষকে শূকর, কুকুর ও অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে।