"তুমি সমস্ত চিত্তে সদাপ্রভুতে বিশ্বাস কর, তোমার নিজ বিবেচনায় নির্ভর করিও না; তোমার সমস্ত পথে তাঁহাকে স্বীকার কর; তাহাতে তিনি তোমার পথ সকল সরল করিবেন" (হিতোপদেশ ৩:৫-৬)।
এই পদে হৃদয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আপনি লক্ষ্য করবেন যে, হিতোপদেশ পুস্তকে বারবার এই বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এখানে আমরা দেখি যে, বিশ্বাস কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো বিষয় নয়। এটি লক্ষণীয় যে, পুরাতন নিয়মের যুগেও রাজা শলোমন বিষয়টি অনুধাবন করেছিলেন, অথচ আমরা অনেক সময় এ বিষয়ে ভুল করে বসি। আমরা হয়তো কিছু সত্য বিষয় বুঝতে পারি (যেমন-ঈশ্বর একজন স্নেহময় পিতা, অথবা ঈশ্বর যীশুর শিষ্যদের ঠিক ততটাই প্রেম করেন যতটা তিনি যীশুকে প্রেম করতেন-তবে মনে রাখবেন, এখানে সবার কথা বলা হচ্ছে না, এমনকি সব বিশ্বাসীর কথাও নয়, বরং সেই শিষ্যদের কথা বলা হচ্ছে যারা তাঁর জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছেন); কিন্তু এসব বিষয় হয়তো কেবল আমার বুদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। পরীক্ষার মুহূর্তে আমি তবুও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি, কারণ আমি অন্তর দিয়ে সেগুলোকে বিশ্বাস করি না। কেবল বুদ্ধিতে কোনো কিছু বিশ্বাস করা-যা অনেকটা শয়তানের বিশ্বাসের মতোই-এবং সর্বান্তকরণে প্রভুর ওপর নির্ভর করা-এ দুয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আর এর জন্য প্রয়োজন পবিত্র আত্মার প্রকাশন।
কোনো বিষয়কে কেবল বুদ্ধিতে বিশ্বাস করার জন্য একজন ভালো বাইবেল শিক্ষকের প্রয়োজন, যিনি বিষয়টি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করবেন-ব্যাস, তাতেই আমরা বিষয়টি বুঝে ফেলি। আমরা মনে করি এটাই বিশ্বাস, কিন্তু পরীক্ষার মুহূর্তে আমরা বুঝতে পারি যে আসলে তা বিশ্বাসই নয়। আমাদের মনে হয় আমাদের কাছে টাকা আছে, কিন্তু দোকানে গিয়ে দেখি সেগুলো আসলে নকল নোট; সেগুলো আসল টাকার কেবল একটি ছবি মাত্র, আসল টাকা নয়। পরীক্ষার মুহূর্তেই প্রকাশ পায় যে আমাদের বিশ্বাসটি হৃদয় থেকে আসেনি, বরং কেবল বুদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। তাই আমাদের অনেক প্রার্থনা করা প্রয়োজন যেন ঈশ্বর আমাদের সেই সত্যের বোধ বা অন্তর্দৃষ্টি দান করেন। তাহলেই আমাদের বিশ্বাস কেবল মনের গণ্ডিতে আটকে থাকবে না, বরং হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত হবে। তখন পরীক্ষার মুহূর্তে সেই বিশ্বাসই আমাদের ধরে রাখবে এবং আমরা টলমল করব না। সর্বান্তকরণে প্রভুর ওপর আস্থা রাখুন!
এরপর তিনি বলেন, "তোমার নিজ বিবেচনায় নির্ভর করিও না।" আমাদের নিজস্ব বুদ্ধি বলতে আমাদের মনের বিচার-বিবেচনা বা যুক্তিকেই বোঝায়। তিনি বলছেন, নিজের মনের ওপর ভরসা না করতে! বরং সর্বান্তকরণে প্রভুর ওপর আস্থা রাখতে। এখানে তিনি মন ও হৃদয়ের মধ্যে একটি পার্থক্য তুলে ধরছেন। তিনি বলছেন, "তোমার মন নির্ভরযোগ্য নয়। তোমার মন হয়তো তোমাকে বলে যে তুমি বিশ্বাস করো ঈশ্বর একজন প্রেমময় পিতা, কিন্তু পরীক্ষার মুহূর্তে তুমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ো। এটিই প্রমাণ করে যে, তুমি হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করো না যে ঈশ্বর একজন প্রেমময় পিতা।" আমাদের মণ্ডলী বা চার্চে আমরা প্রায়ই এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি: বিশ্বাসের প্রধান শত্রু হলো আমাদের নিজস্ব চতুর যুক্তি-বুদ্ধি। এই কারণেই বুদ্ধিমান/ চতুর মানুষদের পক্ষে বিশ্বাসে উপনীত হওয়া অত্যন্ত কঠিন। অসম্ভব নয়, তবে কঠিন; কারণ তারা প্রায়শই নিজেদের বুদ্ধিমত্তার ওপরই নির্ভর করে থাকে। দেখা যায় যে, শাস্ত্র সম্পর্কে প্রচুর জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও বুদ্ধিমান মানুষেরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। পাপের ওপর তারা জয়লাভ করতে পারে না, কারণ তাদের বিশ্বাস নেই। তারা চতুর এবং নিজেদের যুক্তির ওপরই নির্ভর করে।
সমস্ত বাইবেল স্কুল এবং বাইবেল কলেজ একটি বড় ভুল করে থাকে। তারা মানুষকে ঠিক সেই কাজটিই করতে শেখায় যা করতে ঈশ্বরের বাক্য নিষেধ করেছে-আর তা হলো ধর্মশাস্ত্র বোঝা ও ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে নিজেদের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করা। সেখানে পবিত্র আত্মার প্রত্যাদেশের ওপর কোনো গুরুত্বই দেওয়া হয় না; ফলে বাইবেল স্কুল ও কলেজ থেকে বেরিয়ে আসা ব্যক্তিরাই সব জায়গায় ঈশ্বরের কাজের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এর কারণ হলো, তারা এই নীতিটি লঙ্ঘন করে। বাইবেল স্কুলে পড়াশোনা করে বিশ্বাস লাভ করা যায় না; বিশ্বাস আসে পবিত্র আত্মার প্রকাশন থেকে। মণ্ডলীর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা কেবল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিভিন্ন মতবাদ বা শিক্ষা আয়ত্ত করে তা অন্যদের কাছে তুলে ধরব-এমনটা নয়; বরং সেই শিক্ষাগুলোকে আমাদের হৃদয়ে গভীরভাবে ধারণ করতে হবে। সমস্ত হৃদয় দিয়ে প্রভুর ওপর নির্ভর করুন এবং আপনার নিজের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করবেন না।
হিতোপদেশ ৩:৬ পদে বলা হয়েছে, "তোমার সমস্ত পথে তাঁহাকে স্বীকার কর।"অন্য কথায়, আপনার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র ঈশ্বরের হাতে সমর্পণ করুন। আপনার অর্থ-সংক্রান্ত বিষয়, আপনার পড়াশোনা বা পাঠ্য বিষয়, সময়ের ব্যবহার, পারিবারিক জীবনের প্রতিটি দিক, সন্তানদের নিয়ে আপনার আকাঙ্ক্ষা এবং আপনার পেশা-সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে ছেড়ে দিন; জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁকেই নিয়ন্ত্রণ করতে দিন। আপনার সমস্ত পথেই তাঁকে স্বীকার করুন! তাহলেই তিনি আপনার পথকে সরল ও সঠিক করবেন এবং আপনাকে নির্দেশনা দেবেন। অনেকেই আছেন যারা জীবনের কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দেশনা চান এবং বলেন, "হে প্রভু, এই বিষয়ে আপনি যা চান আমি তা-ই করতে প্রস্তুত; আমাকে পথ দেখান।" তখন প্রভু বলেন, "আমি তোমাকে পথ দেখাতে পারি না, কারণ তুমি তোমার সমস্ত পথে আমাকে স্বীকার করো না! কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাকে স্বীকার কর। তুমি যদি তোমার সমগ্র জীবনের নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত থাকো, তবেই আমি তোমাকে সঠিক পথ দেখাব।"
আপনি যদি কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়েই নির্দেশনা চান এবং কেবল সেই একটি বিষয়ই ঈশ্বরের কাছে সমর্পণ করেন, তবে নির্দেশনা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু যদি আপনার সমস্ত পথে-আপনার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে-আপনি তাঁকে স্বীকার করতে চান এবং আমাদের পথ পরিচালনা করতে দেন, তবে তিনি আপনাকে পথ দেখাবেন। এবং শুধু পথ দেখাবেনই না, বরং এও বলা আছে যে তিনি " তোমার পথ সকল সরল করিবেন।" যে পথটি অনেক বাধা-বিপত্তিতে অবরুদ্ধ, তিনি তা আপনার জন্য পরিষ্কার করে দেবেন। ভাই বা বোন, যদি দেখেন যে আপনার চলার পথে নানা বাধা-বিপত্তি বা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তবে কেবল এই কথাটি মনে রাখবেন: যদি আপনি আপনার সমস্ত কাজে ঈশ্বরের স্বীকৃতি স্বীকার করেন, সর্বান্তকরণে তাঁর ওপর নির্ভর করেন এবং নিজের বুদ্ধির ওপর ভরসা না করেন, তবে তিনিই আপনার চলার পথ সুগম করে দেবেন। আপনি নিজে তা পরিষ্কার করতে পারবেন না; আপনি অনেক দিন ধরে চেষ্টা করেছেন। তিনি আপনার জন্য পথ পরিষ্কার করে দেবেন! একবার ভাবুন তো, আমরা কেমন এক জীবনযাপন করতে পারি-যেখানে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তিনিই আমাদের জন্য পথ সুগম করে দেন! এমন জীবনই তো সেই ব্যক্তির, যিনি সর্বান্তকরণে ঈশ্বরের ওপর আস্থা রাখেন, নিজের বুদ্ধির ওপর নির্ভর করেন না এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে স্বীকার করে নেন।