WFTW Body: 

"সকলই তাঁহা হইতে" (রোমীয় ১১:৩৬)। প্রভু যীশু বলেছিলেন যে, যারা আত্মায় দীনহীন, স্বর্গরাজ্য তাদেরই (মথি ৫:৩)। তিনি আরও বলেছিলেন যে, কেবল তারাই সেই রাজ্যে প্রবেশ করবে যারা পিতার ইচ্ছা পালন করে (মথি ৭:২১)। স্বর্গরাজ্য অনন্তকালীন, এবং সেখানে কেবল সেই বিষয়গুলোরই স্থান হবে যা ঈশ্বরের ইচ্ছা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। 'আত্মায় দীনহীন' বলতে তাদেরই বোঝায় যারা নিজেদের মানবিক সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন এবং তাই ঈশ্বরের ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে। এই অর্থে, যীশু সর্বদা আত্মিক দিক দিয়ে দীনহীন ছিলেন।

ঈশ্বর মানুষকে যেভাবে জীবনযাপন করতে চেয়েছিলেন, তিনি ঠিক সেভাবেই জীবন অতিবাহিত করেছেন-ঈশ্বরের ওপর সর্বদা নির্ভরশীল থেকে এবং ঈশ্বরের বাইরে নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা থেকে বিরত থেকে। তাঁর এই কথাগুলো বিবেচনা করুন: "পুত্র নিজে থেকে কিছুই করতে পারেন না... আমি নিজের ইচ্ছায় কিছুই করি না, বরং পিতা আমাকে যা শিখিয়েছেন, আমি তাই বলি... আমি নিজে থেকে আসিনি, বরং তিনিই আমাকে পাঠিয়েছেন... আমি নিজের ইচ্ছায় কথা বলিনি, বরং যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন সেই পিতা নিজেই আমাকে আদেশ দিয়েছেন-কী বলতে হবে ও কীভাবে বলতে হবে... আমি তোমাদের যে কথাগুলো বলি, তা নিজের ইচ্ছায় বলি না; বরং আমার মধ্যে যিনি বাস করেন, সেই পিতাই তাঁর কাজ সম্পন্ন করেন" (যোহন ৫:১৯,৩০; ৮:২৮,৪২; ১২:৪৯; ১৪:১০)।

প্রভু যীশু কেবল কোনো প্রয়োজন দেখেছেন বলেই কোনো কাজ করেননি। তিনি প্রয়োজনটি দেখেছিলেন এবং তা নিয়ে উদ্বিগ্নও ছিলেন, কিন্তু কাজ তখনই করেছেন যখন তাঁর পিতা তাঁকে তা করতে বলেছেন। একজন ত্রাণকর্তার জন্য পৃথিবী যখন চরমভাবে হাহাকার করছিল, তখন তিনি স্বর্গে অন্তত চার হাজার বছর অপেক্ষা করেছিলেন এবং পিতা যখন তাঁকে পাঠালেন, কেবল তখনই পৃথিবীতে এসেছিলেন (যোহন ৮:৪২)। "যখন উপযুক্ত সময়-অর্থাৎ ঈশ্বর নির্ধারিত সময়-উপস্থিত হলো, তখন তিনি আপন পুত্রকে পাঠালেন" (গালাতীয় ৪:৪ - Living Bible)। ঈশ্বর সবকিছুর জন্যই একটি উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করে রেখেছেন (উপদেশক ৩:১)। একমাত্র ঈশ্বরই সেই সময়ের কথা জানেন; তাই প্রভু যীশুর মতো আমরাও যদি সবকিছুর ক্ষেত্রে পিতার ইচ্ছা জানার চেষ্টা করি, তবে আমরা ভুল পথে পরিচালিত হব না। আর পৃথিবীতে এসে প্রভু যীশু কেবল নিজের ভালো মনে হওয়া কাজগুলোই করে বেড়াননি। যদিও তাঁর মন ছিল সম্পূর্ণ নির্মল ও পবিত্র, তবুও মনে কোনো চমৎকার ধারণা এলেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে সে অনুযায়ী কাজ করেননি। না, তিনি তাঁর মনকে পবিত্র আত্মার সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন।

বারো বছর বয়সেই তিনি শাস্ত্রের বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন; তা সত্ত্বেও পরবর্তী আঠারো বছর তিনি তাঁর মায়ের সাথে থেকে ছুতারের কাজ-যেমন টেবিল-চেয়ার তৈরি করা-করেই অতিবাহিত করলেন। তাঁর কাছে সেই বার্তাটিই ছিল যা তাঁর চারপাশের মৃত্যুপথযাত্রী মানুষদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল, অথচ তিনি তখনও প্রচারকার্যে বেরিয়ে পড়েননি। কেন? কারণ পিতার নির্ধারিত সময় তখনও আসেনি।

প্রভু যীশু অপেক্ষা করতে ভয় পেতেন না। "যে ব্যক্তি বিশ্বাস করিবে, সে চঞ্চল হই বে না" (যিশাইয় ২৮:১৬)। আর যখন তাঁর পিতার নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলো, তখন তিনি তাঁর ছুতারের দোকান থেকে বেরিয়ে এসে সুসমাচার প্রচারকার্য শুরু করলেন। এরপর প্রায়শই কোনো কাজের বিষয়ে তিনি বলতেন, " আমার সময় এখনও উপস্থিত হয় নাই" (যোহন ২:৪; ৭:৬)। প্রভু যীশুর জীবনের প্রতিটি বিষয় পিতার সময়জ্ঞান ও ইচ্ছার দ্বারা পরিচালিত হতো। মানুষের প্রয়োজন কখনোই যীশুর কাছে কাজ শুরু করার একমাত্র কারণ হয়ে ওঠেনি; কারণ তা হলে তিনি কেবল নিজের ইচ্ছায় বা নিজের সত্তা থেকে চালিত হয়ে কাজ করতেন। মানুষের প্রয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হতো ঠিকই, কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছাই ছিল পালনীয় বিষয়। যোহন ৪:৩৪ ও ৩৫ পদে প্রভু যীশু বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। প্রয়োজন বা পরিস্থিতি (পদ ৩৫): "দেখ, আমি তোমাদিগকে বলিতেছি, চক্ষু তুলিয়া ক্ষেত্রের প্রতি দৃষ্টিপাত কর, শস্য এখনই কাটিবার মত শ্বেতবর্ণ হইয়াছে..."। কাজের মূলনীতি (পদ ৩৪): "আমার খাদ্য এই, যিনি আমাকে পাঠাইয়াছেন, যেন তাঁহার ইচ্ছা পালন করি ও তাঁহার কার্য্য সাধন করি।" প্রভু যীশু তাঁর বন্ধুদের পরামর্শ অনুযায়ী অনেক ভালো কাজ করেননি; কারণ তিনি জানতেন যে, মানুষের কথায় কান দিয়ে যদি তিনি আপাতদৃষ্টিতে ভালো কোনো কাজ করতেন, তবে পিতা তাঁর জন্য যা সর্বোত্তম ব্যবস্থা রেখেছেন, তা তিনি হারাতেন।

একবার, যখন লোকেরা তাঁকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকার জন্য অনুরোধ করেছিল, তখন তিনি বলেছিলেন যে তিনি তা পারবেন না; কারণ তিনি তাঁর পিতার কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন যা তাঁকে অন্য কোথাও যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিল। মানবিক দৃষ্টিতে সেখানে থেকে যাওয়ার খুব ভালো কারণ ছিল, কারণ তাঁর বার্তার প্রতি সেখানকার মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু ঈশ্বরের চিন্তাধারা মানুষের চিন্তাধারার মতো নয় এবং ঈশ্বরের পথ মানুষের পথের মতো নয় (যিশাইয় ৫৫:৮)। খুব ভোরে যীশু একা প্রার্থনা করতে গিয়েছিলেন এবং পিতার কণ্ঠস্বর শুনেছিলেন (মার্ক ১:৩৫-৩৯)-আর এই ঘটনাটি ঘটেছিল পিতর ও অন্যদের পরামর্শ শোনার আগেই। প্রভু যীশু মানুষের যুক্তির ওপর নির্ভর করেননি। তিনি সেই বাক্যটি মেনে চলেছিলেন যেখানে বলা হয়েছে, "তুমি সমস্ত চিত্তে সদাপ্রভুতে বিশ্বাস কর; তোমার নিজ বিবেচনায় নির্ভর করিও না; তোমার সমস্ত পথে তাঁহকে স্বীকার কর; তাহাতে তিনি তোমার পথ সকল সরল করিবেন" (হিতোপদেশ ৩:৫,৬)। প্রতিটি বিষয়ে নির্দেশনার জন্য তিনি তাঁর পিতার ওপরই নির্ভর করতেন। যিশাইয় ৫০:৪ পদে প্রভু যীশুর বিষয়ে এক ভাববাণীতে আমরা পড়ি, "তিনি (পিতা) প্রভাতে প্রভাতে জাগরিত করেন, আমার কর্ণ জাগরিত করেন, যেন আমি শিক্ষাগ্রাহীদের ন্যায় শুনিতে পাই।" এটিই ছিল প্রভু যীশুর অভ্যাস। তিনি ভোরবেলা থেকে শুরু করে সারাদিন ধরে পিতার কণ্ঠস্বর শুনতেন এবং পিতা তাঁকে যা করতে বলতেন, ঠিক তাই করতেন। কী করবেন তা ঠিক করার জন্য তিনি মানুষের সাথে আলোচনা করতেন না, বরং পিতার সাথে প্রার্থনায় মিলিত হতেন। জাগতিক বা
আত্মিক-প্রাণচালিত খ্রীষ্টানরা মানুষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে পরিকল্পনা করে। আধ্যাত্মিক খ্রীষ্টানরা ঈশ্বরের কাছ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় থাকেন।

প্রভু যীশু তাঁর পিতার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করতেন (যোহন ৬:৫৭)। যীশুর কাছে খাদ্যের চেয়ে ঈশ্বরের বাক্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ ছিল (মথি ৪:৪)। তাঁকে দিনের অনেকবার সরাসরি পিতার কাছ থেকে সেই বাক্য গ্রহণ করতে হতো। আর তা গ্রহণ করার পর তিনি তা পালন করতেন। তাঁর কাছে সেই বাধ্যতাও ছিল প্রাত্যহিক খাদ্যের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ (যোহন ৪:৩৪)। প্রভু যীশু পিতার ওপর নির্ভর করে জীবন অতিবাহিত করতেন। সারাদিন জুড়ে তাঁর মনোভাব ছিল এই রকম: "পিতা, আপনি বলুন, আমি শুনছি।" মন্দিরের ভেতর থেকে অর্থ-বিনিময়কারীদের তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি বিবেচনা করুন। এমন অনেক সময় নিশ্চয়ই এসেছিল যখন যীশু মন্দিরে উপস্থিত ছিলেন এবং সেখানে অর্থ-বিনিময়কারীরাও ছিল, অথচ তিনি তাদের তাড়িয়ে দেননি। তিনি কেবল তখনই তা করেছিলেন যখন পিতা তাঁকে দিয়ে তা করিয়েছিলেন। একজন 'আত্মিক-প্রাণচালিত' (soulish) খ্রীষ্টান হয়তো সবসময়ই অর্থ-বিনিময়কারীদের তাড়িয়ে বেড়াতেন অথবা কখনোই তা করতেন না। কিন্তু যিনি ঈশ্বরের দ্বারা চালিত হন, তিনি জানেন কখন, কোথায় এবং কীভাবে কাজ করতে হবে। এমন অনেক ভালো কাজ ছিল যা প্রভু যীশু করতে পারতেন কিন্তু কখনোই করেননি, কারণ সেগুলো তাঁর জন্য পিতার ইচ্ছার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তিনি সর্বদা সর্বোত্তম কাজগুলো করতেই ব্যস্ত থাকতেন। আর সেগুলোই ছিল যথেষ্ট। তিনি পৃথিবীতে কেবল ভালো কাজ করার জন্য আসেননি, বরং পিতার ইচ্ছা পালন করার জন্যই এসেছিলেন।

বারো বছর বয়সে যোষেফ ও মরিয়মকে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, "কেন আমাকে অন্বেষণ করিলে? আমার পিতার গৃহে আমাকে থাকিতেই হইবে, ইহা কি জানিতে না?" (লূক ২:৪৯)। কেবল সেই কাজগুলো সম্পন্ন করার প্রতিই তাঁর আগ্রহ ছিল। পৃথিবীতে তাঁর সাড়ে ৩৩ বছরের জীবন যখন সমাপ্তির পথে, তখন তিনি গভীর পরিতৃপ্তির সাথে বলতে পেরেছিলেন, "হে পিতা, তুমি আমাকে যে কার্য্য করিতে দিয়াছ, তাহা সমাপ্ত করিয়া আমি পৃথিবীতে তোমাকে মহিমান্বিত করিয়াছি" (যোহন ১৭:৪)। তিনি বিশ্বভ্রমণ করেননি, কোনো বই লেখেননি, তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছিল নগণ্য এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে তখনও অনেক অভাব-অভিযোগ ও প্রয়োজন অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল-তবুও, পিতা তাঁর জন্য যে কাজ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, তিনি তা সম্পন্ন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত কেবল সেই বিষয়টিই মুখ্য।

(চলবে।)