"তোমরা বিচার করিও না, যেন বিচারিত না হও। কেননা যেরূপ বিচারে তোমরা বিচার কর, সেইরূপ বিচারে তোমরাও বিচারিত হইবে; এবং যে পরিমাণে পরিমাণ কর, সেই পরিমাণে তোমাদের নিমিত্ত পরিমাণ করা যাইবে। আর তোমার ভ্রাতার চক্ষে যে কুটা আছে, তাহাই কেন দেখিতেছ, কিন্তু তোমার নিজের চক্ষে যা কড়িকাট আছে, তাহা কেন ভাবিয়া দেখিতেছ না? অথবা তুমি কেমন করিয়া আপন ভ্রাতাকে বলিবে, এস, আমি তোমার চক্ষু হইতে কুটা গাছটা বাহির করিয়া দিই? আর দেখ, তোমার নিজের চক্ষে কড়িকাট রহিয়াছে! হে কপটি, আগে আপনার চক্ষু হইতেকড়িকাট বাহির করিয়া ফেল, আর তখন তোমার ভ্রাতার চক্ষু হইতে কুটা গাছটা বাহির করিবার নিমিত্ত স্পষ্ট দেখিতে পাইবে" (মথি ৭:১-৫)।
এখন, দুর্ভাগ্যবশত, খ্রীষ্টানদের মধ্যে মানুষকে বিচার করা, তাদের তুচ্ছ জ্ঞান করা এবং ঘৃণা করা একটি অত্যন্ত সাধারণ অভ্যাস। খ্রীষ্টানদের মধ্যে নিজেকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা একটি সাধারণ অভ্যাস, যদিও বেশিরভাগ সময় আপনি তাদের সম্পর্কে সবকিছু জানেনও না। ইব্রীয় ৯:২৭ পদে বলা হয়েছে, " মনুষ্যের নিমিত্ত একবার মৃত্যু, তৎপরে বিচার নিরূপিত আছে।" তাহলে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর, এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা, কখন মানুষের বিচার করেন? এই পদ অনুসারে, "একবার মৃত্যু এবং তারপর বিচার।" সুতরাং ঈশ্বর মানুষের বিচার করেন কেবল তাদের মৃত্যুর পরেই।
আপনি কখন মানুষের বিচার করেন? আপনি তাদের মৃত্যুর অনেক আগেই বিচার করেন। তাহলে ঈশ্বর কেন বিচার করার আগে একজন মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করেন? সে হয়তো একজন দুষ্ট লোক, কিন্তু ঈশ্বর বলেন, "তার জন্য আমার আশা আছে। হয়তো সে বদলে যাবে," আর তাই ঈশ্বর অপেক্ষা করেন। ভেবে দেখুন কী হতো যদি ঈশ্বর ক্রুশের উপর মৃত্যুপথযাত্রী সেই চোরটির মৃত্যুর আগেই তার বিচার করতেন, যে স্বর্গে গিয়েছিল। ভেবে দেখুন, যদি ঈশ্বর তার মৃত্যুর কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টা আগেও তার বিচার করতেন। সেটা হতো ভয়াবহ। অবশেষে স্বর্গে যাওয়ার যোগ্য সে-ই ছিল, কিন্তু তার বিচার হতো এবং তাকে নরকে দণ্ডিত করা হতো। ঈশ্বর তার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন, এবং তারপর তাকে স্বর্গে নিয়ে গেলেন। এতে বোঝা যায় যে, ঈশ্বর কোনো ব্যক্তির বিচার করার আগে তার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। মানুষ অধৈর্য এবং মৃত্যুর অনেক আগেই তাদের বিচার করে ফেলে। এটাই মানুষের মূর্খতা। সে সমস্ত তথ্য জানে না। সে ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত, আভ্যন্তরিন জীবনের ৯৯% জানে না। সে জানে না ওই ব্যক্তি কতটা সংগ্রাম করেছে বা প্রার্থনা করেছে, তবুও সে তার বিচার করে। কোনো হাইকোর্টের বিচক্ষণ বিচারপতি এত অল্প প্রমাণের ভিত্তিতে কখনো রায় দেবেন না। যদি কোনো বিচারপতি মামলার মাত্র ১% সম্পর্কে জানেন, তিনি বলবেন, "শুনুন, রায় দেওয়ার আগে আমার আরও প্রমাণ প্রয়োজন। ততদিন পর্যন্ত, আমি রায় স্থগিত রাখব।" প্রত্যেক খ্রীষ্টানেরও এটাই বলা উচিত।
যখন আমরা কোনো ব্যক্তিকে বিচার করি, তখন আমরা আসলে আমাদের নিজেদের হৃদয়ের অবস্থাই প্রকাশ করি। হিতোপদেশ ২৭:১৯ পদে যেমন বলা হয়েছে, "জলমধ্যে যেমন মুখের প্রতিরূপ মুখ, তেমনি মনুষ্যের প্রতিরূপ মনুষ্য-হৃদয়।" অথবা আয়নার মতো, মানুষ তার নিজের প্রতিবিম্বই দেখে। এর অর্থ হলো, সেই ব্যক্তির হৃদয়ে আপনি যেটিকে একটি খারাপ উদ্দেশ্য বলে মনে করেন, তা কেবল আপনার নিজের হৃদয়ের ভুল মনোভাবেরই একটি ইঙ্গিত। আপনি ভাবেন যে, লোকটি কোনোভাবেই ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে কাজটি করতে পারে না। আপনি ভাবেন, "নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো খারাপ উদ্দেশ্য আছে, কারণ আমি নিজেও কেবল খারাপ উদ্দেশ্যেই এমন কাজ করতাম।" আপনি আপনার নিজের হৃদয়কেই প্রকাশ করছেন। অন্য মানুষকে বিচার করা অত্যন্ত মূর্খতা।
সেই অপব্যয়ী পুত্রের গল্পটির কথা ভাবুন। অপব্যয়ী পুত্রের গল্পে আমরা বড়
ছেলের কথা পড়ি।
হারিয়ে যাওয়া পুত্রের প্রত্যাবর্তনে পিতাকে আনন্দ করতে দেখে সে খুব বিচলিত
হয়েছিল। যখন পিতা বাইরে গিয়ে বড় ছেলেকে জিজ্ঞাসা করেন যে সে কেন ভিতরে
আসেনি, তখন লূক ১৫:৩০ পদে দেখুন সে কী বলেছিল, "
তোমার এই যে পুত্র।"
সে (বড় ছেলে) তাকে "আমার এই ভাই" বলেও সম্বোধন করেনি। কী
অবজ্ঞাপূর্ণভাবে কথা বলা!
"সে বেশ্যাদের সঙ্গে তোমার ধন খাইয়া ফেলিয়াছে।"
সে এটা কীভাবে জানল? সে কীভাবে কল্পনা করল যে তার ছোট ভাই বেশ্যাদের সাথে ঘুরে
বেড়িয়েছে? কেউ কি এসে তাকে এই খবর দিয়েছিল? মোটেই না। সে ধরে নিয়েছিল যে তার
এই ছোট ভাই নিশ্চয়ই বেশ্যাদের পেছনে টাকা খরচ করছে। এটা হয়তো মোটেও সত্যি ছিল
না। সে হয়তো মদ খেয়ে বোকামি করে টাকা নষ্ট করছিল, কিন্তু সম্ভবত বেশ্যাদের
পেছনে নয়। কিন্তু যখন ছোট ভাইয়ের প্রতি এই বড় ভাইয়ের মতো ভুল মনোভাব থাকে,
তখন আপনি সবসময় অন্য মানুষটির সম্পর্কে সবচেয়ে খারাপটাই ভাবতে পারেন। আর যখনই
আপনি অন্য কারো সম্পর্কে সবচেয়ে খারাপটা ভাবেন, তখন আপনি বুঝতে পারেন যে
সমস্যাটা অন্য মানুষটির চেয়ে আপনার নিজের মধ্যেই বেশি। অন্য মানুষটি হয়তো শেষ
পর্যন্ত তার বাবার সাথে খাবার টেবিলে বসে হৃষ্টপুষ্ট বাছুরের মাংস উপভোগ করবে,
আর আপনি হয়তো বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকবেন।
অপব্যয়ী পুত্রের গল্পটি এমন একটি গল্প, যার শুরুতে ছোট ছেলেটি বাড়ির বাইরে এবং বড় ছেলেটি ভেতরে থাকে। গল্পের শেষে, ছোট ছেলেটি বাড়ির ভেতরে থাকে এবং বড় ছেলেটি বাড়ির বাইরে থাকে, কারণ সে মানুষের বিচার করেছিল। মনে রাখবেন, অপর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মানুষের বিচার করার কারণে যেন আপনাকে পিতার বাড়ির বাইরে যেতে না হয়। সবচেয়ে নিরাপদ কাজ হলো বিচার না করা।
বিচার করো না। প্রভু যীশু বলেন, তোমরা যদি বিচার করেও থাকো, তবে তোমরা কী করছো? তোমাদের ভাইয়ের চোখের একটি ক্ষুদ্র কণা নিয়ে বিচার করছো, যখন তোমাদের নিজেদের চোখেই একটি বড় কাষ্ঠখণ্ড রয়েছে? তিনি এটাই বলেছেন। মানুষের চোখে এই কাষ্ঠখণ্ডটা আবার কী? আপনার চোখের ভেতরে তো আর কোনো কাষ্ঠখণ্ড থাকতে পারে না। কিন্তু যীশু বাড়িয়ে বলছেন এটা বোঝানোর জন্য যে, তার পাপের তুলনায় আপনার পাপ কতটা গুরুতর। এটা ঠিক যে, হয়তো সে ভয়ানক কোনো ভুল করেছিল। কিন্তু সেই ব্যক্তির প্রতি আপনার অপ্রেমপূর্ণ মনোভাব তার পাপের তুলনায় একটি কাষ্ঠখণ্ডের মতো ,যা কিনা কেবল একটি ক্ষুদ্র কণার সমান।
হয়তো সে বেশ্যাদের কাছে গিয়েছিল। ঠিক আছে, সেটা একটা পাপ। কিন্তু তার প্রতি আপনার অপ্রেমিক মনোভাবের তুলনায় সেটাও কিছুই না। ওটা তো একটা কাষ্ঠখণ্ডের মতো। প্রভু বলেন, অন্যদের প্রতি আপনার অপ্রেমিক মনোভাব দূর করতে। তিনি বলেন যে, সেই ব্যক্তির প্রতি অপ্রেমিক মনোভাব আপনাকে ক্রমাগত তার দোষ খুঁজে বেড়াতে প্ররোচিত করে। সেই ব্যক্তি যা-ই করুক না কেন, আপনি তার পেছনে ভুল উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়ান। সেই ব্যক্তি কোনো ভালো কাজ করতে পারে না। আপনার চোখে লোকটি মন্দ, কিন্তু আপনি দেখতে পান না যে তার প্রতি এমন অপ্রেমিক মনোভাব রাখার জন্য আপনি নিজেই কতটা মন্দ। তাহলে তিনি কী বলেন? এমন একজন লোকের কথা ভাবুন যার দৃষ্টিশক্তি খুব কম। আপনি কি আপনার চোখ থেকে কিছু বের করার জন্য সেই ব্যক্তির কাছে যাবেন? আপনি কি এমন একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন যিনি ছানি এবং চোখের অন্যান্য সমস্যার কারণে প্রায় অন্ধ? তিনি কীভাবে আপনার চোখে চোখ রেখে সেখান থেকে একটি ছোট কণা বের করতে পারেন? আমি সেই ব্যক্তির ধারেকাছেও যেতে চাইব না।
প্রভু এটাই বলেন। আপনি আপনার ভাইকে কী করে বলতে পারেন, "এস, আমি তোমার চক্ষু হইতে কুটা গাছটা বাহির করিয়া দিই", যখন আপনার নিজের চোখেই একটা বিরাট কাঠের গুঁড়ি রয়েছে যা আপনাকে ঠিকমতো দেখতে দেয় না? আপনি তো তার চোখের ক্ষতি করতে পারেন। কিন্তু প্রভু বলেন, "ওরে ভণ্ড! তোমার এই অপ্রেমিক মনোভাব দেখ।" মথি ৭:৫ অনুসারে, প্রত্যেক ব্যক্তি যার অন্য ব্যক্তির প্রতি অপ্রেমিক মনোভাব রয়েছে এবং যে সেই ব্যক্তির বিচার করে, সে একজন ভণ্ড। প্রথমে এই অপ্রেমিক মনোভাব দূর করুন, তাহলেই আপনি পরিষ্কারভাবে দেখতে পাবেন। তখন সেই ভাই হয়তো নিজের ইচ্ছায় আপনার কাছে এসে বলবে, "ভাই, দয়া করে আমার চোখ থেকে কণাটা বের করে দেবেন?" যখন আপনি এই ধরনের পরিস্থিতিতে পড়বেন, তখন ব্যাপারটা কি চমৎকার নয়?