প্রভু যীশুই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি জন্মের আগেই নিজের পরিবার বেছে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। আমাদের কারওই সেই সুযোগ ছিল না।
প্রভু যীশু কোন পরিবারটি বেছে নিয়েছিলেন? নাসরৎ নামের এক জায়গার এক সাধারণ ছুতারের পরিবার-যে শহরটি সম্পর্কে লোকে বলত, "নাসরৎ হইতে কি উত্তম কিছু উৎপন্ন হইতে পারে?" (যোহন ১:৪৬)। যোষেফ ও মরিয়ম এতটাই দরিদ্র ছিলেন যে, ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে হোমবলি হিসেবে একটি মেষশাবক উৎসর্গ করার সামর্থ্যও তাঁদের ছিল না (লূক ২:২২-২৪ এবং লেবীয় পুস্তক ১২:৮-এর তুলনা করুন)।
তাছাড়া, যীশুই ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি জন্মের আগেই ঠিক করতে পেরেছিলেন যে তিনি ঠিক কোথায় জন্মগ্রহণ করবেন। নিজের জন্মস্থান বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি কোন স্থানটি পছন্দ করেছিলেন? এক সাধারণ আস্তাবলে রাখা গবাদি পশুর খাবার পাত্র!
প্রভু যীশু নিজের জন্য যে বংশপরিচয় বা বংশধারা বেছে নিয়েছিলেন, সেদিকেও লক্ষ্য করুন। মথি ১:৩-৬ পদে বর্ণিত যীশুর বংশলতিকায় চারজন নারীর নাম পাওয়া যায়। প্রথমজন হলেন তামর, যিনি তাঁর শ্বশুর যিহূদার সাথে ব্যভিচারের ফলে এক পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়জন হলেন রাহব, যিনি যিরীহো নগরের একজন পরিচিত বারবনিতা ছিলেন। তৃতীয়জন হলেন রূৎ, যিনি মোয়াবের বংশধর ছিলেন; আর মোয়াব জন্মেছিলেন লোটের সাথে তাঁর নিজের কন্যার ব্যভিচারের ফলে। চতুর্থজন হলেন ঊরিয়ের স্ত্রী বাৎশেবা, যার সাথে দায়ূদ ব্যভিচার করেছিলেন।
প্রভু যীশু কেন এমন এক কলঙ্কিত বংশপরিচয় বেছে নিয়েছিলেন? যাতে তিনি আদমের পতনশীল মানবজাতির সাথে নিজেকে পুরোপুরি একাত্ম করতে পারেন। এখানেই আমরা তাঁর নম্রতা দেখতে পাই। বংশমর্যাদা বা কুলপরিচয় নিয়ে গর্ব করার কোনো আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না।
প্রভু যীশু নিজেকে মানুষের সাথে সম্পূর্ণভাবে এক করে নিয়েছিলেন। জাতি, বংশপরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সকল মানুষের মৌলিক সাম্যে বিশ্বাস করতেন এবং সমাজের সবচেয়ে নগণ্য ও নিম্নস্তরের মানুষের সাথে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছিলেন। তিনি সবার সেবক হওয়ার জন্য নিজেকে সবার নিচে নামিয়ে এনেছিলেন। একমাত্র তিনিই অন্যদের ওপরে তুলতে পারেন, যিনি নিজে তাদের নিচে অবস্থান করেন। আর প্রভু যীশু ঠিক এভাবেই এসেছিলেন।
পবিত্র আত্মা আমাদের মনকে নূতনীকরণ দ্বারা আমাদের রূপান্তরিত করেন (রোমীয় ১২:২)। আমাদের চিন্তার জগতেই খ্রীষ্টসদৃশ প্রকৃত নম্রতার বীজ বপন করা হয়। আমরা কি এই বিষয়ে খ্রীষ্টের সদৃশ হয়ে উঠছি কি না, তা আমাদের কাজ বা অন্যদের সামনে আমাদের আচরণের দ্বারা নয়, বরং আমাদের চিন্তাভাবনার মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব-বিশেষ করে নিজেদের বিষয়ে এবং অন্যদের সাথে নিজেদের তুলনা করার ক্ষেত্রে আমাদের চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে।
যখন আমরা নিজেদের চিন্তায় সত্যিই ক্ষুদ্র বোধ করি, কেবল তখনই আমরা আন্তরিকভাবে "প্রত্যেক জন আপনা হইতে অন্যকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করতে" (ফিলিপীয় ২:৩) এবং নিজেদের "সমস্ত পবিত্রগণের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা ক্ষুদ্রতম" (ইফিষীয় ৩:৮) বলে মনে করতে পারি।
প্রভু যীশু সর্বদা পিতার সামনে নিজেকে একজন মানুষ হিসেবে নগণ্য বলে মনে করতেন। তাই, পিতার মহিমা তাঁর মধ্য দিয়ে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছিল।
ত্রিশ বছর ধরে প্রভু যীশু একজন অসিদ্ধ পালক-পিতা ও মাতার বশবর্তী হয়ে ছিলেন-কারণ এটিই ছিল তাঁর পিতার ইচ্ছা। যোষেফ ও মরিয়মের চেয়ে তিনি অনেক বেশি জানতেন এবং তাঁদের মতো তিনি পাপী ছিলেন না; তবুও তিনি তাঁদের বশবর্তী হয়েছিলেন।
বুদ্ধিবৃত্তিক বা আধ্যাত্মিক দিক থেকে নিজের চেয়ে নিম্নমানের কারো কাছে বশবর্তী হওয়া মানুষের পক্ষে সহজ নয়। কিন্তু প্রকৃত নম্রতার ক্ষেত্রে এতে কোনো সমস্যা নেই; কারণ যিনি ঈশ্বরের দৃষ্টিতে নিজেকে সত্যিই তুচ্ছ বা নগণ্য বলে দেখেছেন, ঈশ্বরের দ্বারা নিযুক্ত কোনো ব্যক্তির কাছে নতিস্বীকার করতে তাঁর কোনো অসুবিধা হয় না।
প্রভু যীশু বেশ সাধারণ একটি পেশা-ছুতোরের কাজ-বেছে নিয়েছিলেন। আর যখন তিনি তাঁর প্রকাশ্য সেবাকার্য শুরু করলেন, তখন তাঁর নামের আগে বা পরে কোনো বিশেষ উপাধি বা পদবি যুক্ত ছিল না। তিনি 'যাজক যীশু' ছিলেন না; 'রেভারেন্ড ডক্টর যীশু' -সে তো আরওই নন! তিনি পার্থিব কোনো পদমর্যাদা বা উপাধি কখনোই খোঁজেননি বা আকাঙ্ক্ষা করেননি-যা তাঁকে সেই সাধারণ মানুষের চেয়ে উচ্চাসনে বসাতে পারত, যাদের সেবা করার জন্যই তিনি এসেছিলেন।
পিতার সামনে যীশু নিজেকে 'শূন্য' বা নগণ্য হিসেবে স্থাপন করেছিলেন বলেই, পিতার আদিষ্ট যেকোনো বিষয় তিনি আনন্দের সাথে মেনে নিতে এবং পিতার সমস্ত আদেশ সর্বান্তকরণে পালন করতে পেরেছিলেন।
"আপনাকে অবনত করিলেন, মৃত্যু পর্য্যন্ত, এমন কি, ক্রুশীয় মৃত্যু পর্য্যন্ত আজ্ঞাবহ হইলেন"। (ফিলিপীয় ২:৮)
ঈশ্বরের প্রতি এমন পূর্ণ আনুগত্যই হলো প্রকৃত নম্রতার সুস্পষ্ট চিহ্ন। এর চেয়ে স্পষ্ট পরীক্ষা আর নেই।
যার শোনার কান আছে, সে শুনুক।